রিমন পালিত: বান্দরবান:বান্দরবানের রোয়াংছড়ি উপজেলাকে বাল্যবিবাহমুক্ত উপজেলা হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে স্থানীয় সামাজিক নেতৃত্ব ও প্রশাসনের সমন্বয়ে ব্যাপক উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর অংশ হিসেবে বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে কারবারি, হেডম্যান, জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনের কর্মকর্তাদের নিয়ে মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (৩ সেপ্টেম্বর) সকাল সাড়ে ১১টায় রোয়াংছড়ি উপজেলা টাউন হলে এ সভা অনুষ্ঠিত হয়। হিউম্যানিটারিয়ান ফাউন্ডেশনের আয়োজনে এবং ওয়ার্ল্ড ভিশন বাংলাদেশের সহযোগিতায় সংস্থাটির রোয়াংছড়ি এরিয়া ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রামের আওতায় এ সভার আয়োজন করা হয়। রোয়াংছড়ি সদর ও আলেক্ষ্যং ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামকে পর্যায়ক্রমে বাল্যবিবাহমুক্ত করার লক্ষ্যে স্থানীয় পর্যায়ে সামাজিক নেতৃত্বকে সম্পৃক্ত করাই ছিল সভার মূল উদ্দেশ্য।
হিউম্যানিটারিয়ান ফাউন্ডেশনের এরিয়া প্রোগ্রাম ম্যানেজার উসাইম্যা মারমার সঞ্চালনায় সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন রোয়াংছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) ও সহকারী কমিশনার (ভূমি) ফারহান ফয়েজ।
বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন রোয়াংছড়ি সদর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মেহ্লাঅং মারমা, আলেক্ষ্যং ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বিশ্বনাথ তঞ্চঙ্গ্যা, রোয়াংছড়ি থানার প্রতিনিধি এএসআই লোকমান হোসেন, ৩৩৮ নম্বর রোয়াংছড়ি মৌজার হেডম্যান প্রতিনিধি হ্লামং মারমা, ৩৪১ নম্বর পাইক্ষ্যং মৌজার হেডম্যান বয়থাং বম এবং ৩৪৯ নম্বর ঘেরাউ মৌজার হেডম্যান শৈসাঅং মারমা।
সভায় স্বাগত বক্তব্য দেন ওয়ার্ল্ড ভিশন বাংলাদেশের ম্যানেজার চাংম্বুগং। তিনি বাল্যবিবাহ প্রতিরোধের পাশাপাশি শিশুদের অপুষ্টি দূরীকরণে চলমান বিভিন্ন কার্যক্রম তুলে ধরেন। দুর্গম ও প্রত্যন্ত এলাকায় শিশু সুরক্ষা নিশ্চিত করতে প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি, সামাজিক নেতৃত্ব ও উন্নয়ন সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বিত উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
সভায় প্রজেক্টরের মাধ্যমে বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে পরিচালিত প্রকল্পের বিভিন্ন কার্যক্রম, লক্ষ্য, পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন কৌশল তুলে ধরা হয়। পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ে বাল্যবিবাহের ঝুঁকিতে থাকা পরিবার চিহ্নিত করা, সচেতনতা বৃদ্ধি এবং সম্ভাব্য বাল্যবিবাহের বিষয়ে দ্রুত প্রশাসনকে অবহিত করার বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা করা হয়।

সভায় বক্তারা বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের দুর্গম গ্রামগুলোতে বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে শুধু প্রশাসনের আইন প্রয়োগই যথেষ্ট নয়। এ ক্ষেত্রে স্থানীয় সামাজিক নেতৃত্বকে আরও সক্রিয় ও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। বিশেষ করে কারবারি ও হেডম্যানরা গ্রামের মানুষের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত থাকায় কোনো পরিবার বাল্যবিবাহের উদ্যোগ নিলে তা আগেভাগে শনাক্ত করে পরিবারকে সচেতন করা এবং প্রয়োজনে প্রশাসনকে তথ্য দেওয়ার ক্ষেত্রে তাঁরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে ফারহান ফয়েজ বলেন, “বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে শুধু প্রশাসনের উদ্যোগ যথেষ্ট নয়; গ্রামের প্রধান, কারবারি, হেডম্যান, জনপ্রতিনিধি, শিক্ষক, অভিভাবক ও তরুণদের সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে। কোনো এলাকায় বাল্যবিবাহের ঘটনা যাতে না ঘটে, সে জন্য স্থানীয় পর্যায়ে আগাম তথ্য প্রদান ও সামাজিক সচেতনতা বাড়াতে হবে।”
তিনি বলেন, বাল্যবিবাহ একটি সামাজিক সমস্যা। এটি প্রতিরোধে আইন প্রয়োগের পাশাপাশি পরিবার ও সমাজের মানসিকতার পরিবর্তন প্রয়োজন। স্থানীয় নেতৃত্বকে সম্পৃক্ত করে গ্রামভিত্তিক উদ্যোগ গ্রহণ করা গেলে বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে আরও কার্যকর ফল পাওয়া সম্ভব।
ফারহান ফয়েজ আরও বলেন, বাল্যবিবাহের কারণে একটি শিশুর শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ নানা ঝুঁকির মধ্যে পড়ে। তাই কোনো পরিবার যাতে সামাজিক বা অর্থনৈতিক চাপের কারণে অল্প বয়সে সন্তানকে বিয়ে দিতে বাধ্য না হয়, সে বিষয়ে স্থানীয়ভাবে সচেতনতা তৈরির পাশাপাশি ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারগুলোর প্রতি নজরদারি বাড়াতে হবে।
সভায় রোয়াংছড়ি সদর ও আলেক্ষ্যং ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকার কারবারি, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, প্রশাসনের প্রতিনিধি এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা অংশ নেন। আলোচনায় বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে গ্রামভিত্তিক সচেতনতা কার্যক্রম জোরদার, ঝুঁকিপূর্ণ পরিবার চিহ্নিতকরণ, স্থানীয় সামাজিক নেতৃত্বকে সক্রিয় করা এবং প্রশাসন ও স্থানীয় নেতৃত্বের মধ্যে দ্রুত তথ্য আদান-প্রদান নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
সভা শেষে বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ এবং রোয়াংছড়ির বিভিন্ন গ্রামকে পর্যায়ক্রমে বাল্যবিবাহমুক্ত করার লক্ষ্যে অংশগ্রহণকারীরা অঙ্গীকারনামায় স্বাক্ষর করেন। স্থানীয় পর্যায়ে সামাজিক নেতৃত্ব ও প্রশাসনের এই সমন্বিত উদ্যোগ রোয়াংছড়িতে বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে সংশ্লিষ্টরা আশা প্রকাশ করেন।